কুয়াকাটার একাল-সেকাল
দুই যুগে পর্যটক-ব্যবসা বেড়েছে, সাগরে বিলীন সৈকত-বন
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৮-০৯-২০২৬ ০৩:১৮:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৮-০৯-২০২৬ ০৩:১৮:১৫ অপরাহ্ন
সংবাদচিত্র : ফোকাস বাংলা নিউজ
দুই যুগ আগে কুয়াকাটা ছিল অনেকটাই নিরিবিলি সমুদ্র উপকূলীয় জনপদ। সাগর, বালুচর, ঝাউ-নারকেলবাগান, কৃষিজমি, রাখাইন পল্লী আর মৎস্যজীবীদের জীবন ছিল এর প্রধান পরিচয়। পর্যটকের আনাগোনা ছিল সীমিত। আবাসিক হোটেল-মোটেলও ছিল হাতে গোনা। ২০০০ থেকে ২০২৬- এই সময়কালে বদলে গেছে সেই চিত্র। কুয়াকাটা এখন দেশের অন্যতম পরিচিত সমুদ্র পর্যটনকেন্দ্র। বেড়েছে পর্যটক, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও নানা ধরনের পর্যটন ব্যবসা। একই সঙ্গে বেড়েছে জমির ওপর চাপ এবং কমেছে প্রাকৃতিক পরিসর।
পর্যটকের চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০২২ সালে কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির হিসাবে পদ্মা সেতুর আগে বছরে ১২-১৫ লাখ পর্যটক আসতেন। পদ্মা সেতু চালুর পর ব্যবসায়ীরা বছরে ২২-২৫ লাখ পর্যটক আসার প্রত্যাশা করেন। ২০২৪ সালের দুর্গাপূজার চার দিনের ছুটিতেই এক লাখের বেশি পর্যটক কুয়াকাটায় এসেছিলেন। তখন সমিতিভুক্ত আবাসিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭৪টি; থাকার সক্ষমতা ছিল ২৫-৩০ হাজার পর্যটকের।
শুধু হোটেল ব্যবসাই নয়, পর্যটনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। ২০২৩ সালের হিসাবে দুই শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের পাশাপাশি অর্ধশতাধিক খাবারের হোটেল, প্রায় ১ হাজার বীচ বাইকার, ২৫০ ফটোগ্রাফার এবং চার শতাধিক ভাসমান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পর্যটননির্ভর হয়ে পড়েন। ২০২২ সালে সৈকত এলাকায় ফিশ ফ্রাইয়ের দোকান ছিল প্রায় ৪৫টি এবং ৩০০-৩৫০টি ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চলাচল করত।
কিন্তু পর্যটনের এই বিস্তারের বিপরীতে প্রকৃতির ক্ষতির চিত্রও বড়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৫ বছরে কুয়াকাটার প্রায় ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার বেলাভূমি সাগরে বিলীন হয়েছে। প্রায় ২০০ একরের নারকেলবাগানের ৯৯ শতাংশ হারিয়ে গেছে। আরেকটি হিসাবে ১৩ বছরে ৩ হাজার ৩৮৭ একর বনভূমির মধ্যে ২ হাজার ৮৭ একর, অর্থাৎ ৬১ দশমিক ৬১ শতাংশ, সাগরে বিলীন হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
কুয়াকাটার জমির ব্যবহারও দ্রুত বদলাচ্ছে। সরকারের কুয়াকাটা ট্যুরিজম সেন্টার (KTC) মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এলাকায় প্রায় ৪,১৮৬ একর জমি গ্রামীণ বসতি এবং ৪,৯৮৬ একর কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। পরিকল্পনায় কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের জন্য ৩২৮ একর পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা এবং প্রায় ১৩০ একর Urban Reserve রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
বনভূমির অবস্থাও উদ্বেগজনক। KTC মাস্টারপ্ল্যানের হিসাবে বর্তমানে লেম্বুর বন ৫৫৭ একর এবং গঙ্গামতির বন ১ হাজার ১০৮ একরসহ মোট ১ হাজার ৬৬৫ একর বনভূমি রয়েছে। পরিকল্পনায় বনভূমি সংরক্ষণ এবং সেখানে অনিয়ন্ত্রিত ভৌত উন্নয়ন বন্ধের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে সংরক্ষিত বনভূমি দখলের অভিযোগও রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কুয়াকাটার ৩৭৮ জন দখলদারের বিরুদ্ধে ২৫১ দশমিক ৭৪ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখলের তথ্য পাওয়া গেছে।
কুয়াকাটার এই পরিবর্তন সামাল দিতে সরকার সৈকত রক্ষা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সৈকত রক্ষায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৫০০ মিটার এলাকায় প্রায় ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ও টিউব স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সৈকত রক্ষা ও উন্নয়নে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়ার তথ্য রয়েছে। রয়েছে KTC মাস্টারপ্ল্যান ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনাও।
২০০০-এর কুয়াকাটা ছিল প্রকৃতিনির্ভর; ২০২৬-এর কুয়াকাটা অনেক বেশি পর্যটন ও বাণিজ্যনির্ভর। এখন চ্যালেঞ্জ হলো—পর্যটকের সংখ্যা, ব্যবসা ও অবকাঠামো যতই বাড়ুক, সেই উন্নয়নের চাপে যেন সৈকত, বন, কৃষিজমি, খাসজমি ও স্থানীয় বসতি হারিয়ে না যায়। কারণ কুয়াকাটাকে পর্যটনকেন্দ্র বানিয়েছে তার প্রকৃতিই; সেই প্রকৃতি হারালে পর্যটনের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এইচকে/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স